আইনজীবী-বিচারকের বাগবিতণ্ডায় আদালতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের শঙ্কা

আইনজীবী-বিচারকের বাগবিতণ্ডায় আদালতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের শঙ্কা

বিচার চলার সময় আদালতের এজলাস ভাঙচুর, বাগবিতণ্ডা যেমন বিচারক, আইনজীবী ও দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করছে, তেমনি বিচার বিভাগের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।—এমন মন্তব্যই করছেন সাবেক জেলা জজ ও দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা।

শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের মতে, আদালতের ভেতরে এ রকম আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়, এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার বিভাগ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। তারা আইনজীবী সমিতি (বার) ও বেঞ্চের সমন্বয় থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বার কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুযায়ী, আদালতের বিচারক হলেন প্রিসাইডিং অফিসার (আদালতে বিচার চলার সময় সভাপতি) আর আইনজীবীরা হলেন কোর্ট অফিসার (আদালতের কর্মকর্তা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সে ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক না থাকলে বিচারকাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে না।

সম্প্রতি ঢাকা জজ আদালত, চট্টগ্রাম জজ আদালতে ভাঙচুর ও হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে মামলা শুনানি নিয়ে বিচারক, আইনজীবী ও আদালতের নির্ধারিত পেশকার (নিম্ন আদালতের জন্য), বেঞ্চ অফিসার (হাইকোর্ট) মধ্যে বাগবিতণ্ডার ঘটনা লক্ষ করা গেছে। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় সবার জন্যই অমঙ্গল বয়ে আনছে কি না বা বিচার বিভাগের ওপর এ ধরনে ঘটনা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে কি না তা নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা হয় দেশের শীর্ষ আইনজীবী সংগঠনের নেতা ও সাবেক বিচারকদের সঙ্গে।

সাবেক জেলা জজ ও সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল ইকতেদার আহমেদ বলেন, আদালতে বিচার চলাকালে বিচারক, আইনজীবী ও দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও ছোড়াছুড়ির ঘটনা দুঃখজনক।’ এসব ঘটনা বিচার বিভাগের ওপর প্রভাব ফেলবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আসামির জামিন নামঞ্জুরের পর নিম্ন আদালত থেকে জামিন আবেদনটি ফেরত নেওয়ার সুযোগ নেই। আর উচ্চ আদালতে আসামির জামিন নামঞ্জুরের সম্ভাবনা থাকলে জামিন আবেদন ফেরত নেওয়া খারাপ নজির।’

ইকতেদার আহমেদ আরও বলেন, ‘গতকাল ঢাকা জজ আদালতে আসামিকে জামিন না দেওয়ার ঘটনায় আইনজীবী, পেশকার, পিয়নের মধ্যে মারামারির ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক।’ তিনি এ ঘটনার আইনজীবীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি আদালতে যাবেন আদেশ পাওয়ার জন্য, অথচ বিচারককে সম্মান করবেন না, সেটি হতে পারে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল বাসেত মজুমদার বলেন, ‘একজন আইনজীবীকে আইনজীবীর মতোই ব্যবহার করা উচিত। আইনজীবী সমিতি (বার) ও বেঞ্চের (আদালত বা বিচারক) মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। আমরা আইনজীবী, আইনের লড়াই করি। আমরা মক্কেলের পক্ষে আদালতে কথা বলি। মক্কেলকে নিয়ে কোর্টে যাই। মক্কেলকে আইনের সহায়তা দেই। এখানে আমাদের উত্তেজিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলি, আমাদের এখানে কিছু পেশকার আছে, যারা অসৌজন্যমূলক আচরণ করে। ঢাকা কোর্টের ঘটনা দুঃখজনক। এ ঘটনার কোনোটাই উচিত হয় নাই।’

বাসেত মজুমদার আরও বলেন, ‘বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষায় আমাদেরকে বার ও বেঞ্চের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। যাতে করে সুষ্ঠু-স্বাধীন বিচার বিভাগ গড়ে তোলা যেতে পারে।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘এটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা হওয়া উচিত না। বার ও বেঞ্চের মধ্যে সব সময় সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।’ বিচারকাজ পরিচালনায় বার ও বেঞ্চের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

জয়নুল আবেদীন আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য ভবিষ্যতে বারও লক্ষ রাখবেন, বেঞ্চও লক্ষ রাখবেন। এটি দেশের স্বার্থে, বিচার বিভাগের স্বার্থে।’

এ ক্ষেত্রে পাবলিক প্রসিকিউটরদের কী ভূমিকা থাকা উচিত—এমন প্রশ্নের জবাবে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘শুধু পিপিদের ওপর না, সবার ওপর দায়িত্ব থাকবে সহনশীল থাকা। বিচার বিভাগ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আইনজীবীদের সংগঠন (বার) ও আদালতের (বেঞ্চ) মধ্যে অবশ্যই সুসম্পর্ক থাকতে হবে। না হলে এ ধরনের ঘটনা বিচার বিভাগের জন্য ক্ষতি বয়ে আনবে। শুধু আইনজীবী নয়, বিচারক এমন কাজ করবেন না, যাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সমালোচনা হয়।’

২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি মানবপাচারের অভিযোগে দায়ের করা এক মামলার আসামিকে জামিন না দেওয়ায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১-এর আদালত কক্ষে ভাঙচুর চালান আইনজীবীরা। এ ঘটনায় পুলিশের সঙ্গেও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর হাকিম সাহাদাৎ হোসেন ভূঁইয়া এজলাস ছেড়ে নিজের খাস কামরায় চলে যান। এরপর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১-এর আদালতে আবার শুনানি হয়। শুনানি শেষে অভিযুক্ত আইনজীবীকে চার হাজার টাকা বন্ডে জামিন দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামে আদালতের এজলাস কক্ষে ভাঙচুরের ঘটনা তদন্তে কমিটিও করে দেন সে সময়ের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।

২০১৭ সালের ১০ জুলাই উচ্চ আদালতের এজলাস কক্ষে ভাঙচুর, বেঞ্চ কর্মকর্তাকে মারধর ও আদালতের কার্যক্রমে ব্যাঘাতের সৃষ্টির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আদালত সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বিরুদ্ধে রুল জারি করে। এরপর আইনজীবীরা এ ঘটনায় নিঃশর্ত ক্ষমা চান আদালতের কাছে। শুনানি করে হাইকোর্ট বেঞ্চ তাদের সতর্ক করে ক্ষমা করে দেয়।

সর্বশেষ, মঙ্গলবার (২৪ এপ্রিল) ঢাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের (সিজেএম) আদালতের গেট বন্ধ করে আইনজীবীদের মারামারি করার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিএমএম আদালতে এ ঘটনা ঘটে। আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন এক আসামি। শুনানি করে বিচারক আতিকুল ইসলাম জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। এ সময় ওই আসামি পক্ষের আইনজীবী জামিনের আবেদন ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আবেদন করেন। আদালত সেটিও নামঞ্জুর করেন। এরপর এ বিষয়টি নিয়ে বিচারক এজলাসে থাকা অবস্থায়ই আসামি পক্ষের আইনজীবী ও আদালতের পেশকারের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। পরে বিচারক চলে গেলে আদালতের স্টাফরা আইনজীবীদের মারধর করেন। এ ঘটনায় আইনজীবীরা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সব আদালত বর্জন করার ঘোষণা দেন।

ফেইজবুক থেকে পাঠকের মন্তব্য

আপনার জন্য নির্বাচিত

পুলিশ-শিক্ষার্থী সংঘর্ষ মামলার প্রতিবেদন ১৭ জুলাই

রাজধানীর শাহবাগে রুটিনসহ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার দাবিতে ঢাকা